Dream Narratives: Two

স্বপ্নের শুরুতে আমি জানি সু-এর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি যাদবপুর। স্কুলের বন্ধু, এখন আর তেমন যোগাযোগ কী মনের মিল নেই।আমার মোটে যাওয়ার ইচ্ছে নেই, কিন্তু ভীষণ পিড়াপিড়ি করেছিল, আর আমিও তেমন ফোন করি না, অগত্যা কিঞ্চিৎ অনুশোচনা থেকেই যাচ্ছি।

ট্যাক্সিতে আছি। ঘড়ি দেখছি, ৮টা বাজে। আমি ভাবছি এত রাতে গিয়ে ফিরতে পারব তো? আগের দিনও তো ফিরেছিলাম, কিন্তু সে তো অনেক আগে গেছিলাম। গাড়ি চলছে তো চলছেই।

বাইরে কিন্তু বিকেল। মরা হলুদ আলো। মানিকতলা পেরোচ্ছি, দৈত্যের মত পুরোনো সব বাড়ি সার দিয়ে দু’পাশে ঝুঁকে পড়ছে মাথার উপর। কিন্তু ঘড়ি এগিয়ে চলেছে, সাড়ে ৮টা, পৌনে ৯টা, ৯টা। ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে যাই। ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়লাম একটা গলি রাস্তার সামনে। দেখতে কনভেন্ট রোডের মত। বিশাল বিশাল গাছ আর ভাঙ্গাচোরা পাঁচিল দু’ধারে। জনমানুষ নেই।

রাস্তাটা বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে গেছে। বাঁকের মোড়টায় একটা রেল স্টেশন। স্বপ্নে আমি জানি এটা পাতিপুকুর স্টেশন। এখান থেকে বিধাননগর চলে যাওয়া যাবে। গতি বাড়ালাম, কিন্তু পরণের ছাইরঙা শাড়ি পায়ে জড়াচ্ছে পদে পদে। পাশ দিয়ে এ বার একটি দু’টি করে লোক যাচ্ছে। একটি গোলাপি শার্ট পরা হালকা গোঁফ ওঠা ছেলে গেল। এই ছেলেটিকে আমি সেদিন একটা গানের অনুষ্ঠানে দেখেছি। আমার পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল, একবার  চোখাচোখি হল কিন্তু চিনতে পারল বলে মনে হল না। আমি কি চাইছিলাম চিনতে পারুক?

উঠছি তো উঠছি, ভীষণ চওড়া সিঁড়ি, ভীষণ খাড়াই। পা-কোমর যেন ব্যথা করছে, এক পা এক পা করে উঠছি। দেখছি আশপাশে বাকিরাও একইরকম টেনে টেনে উঠছে। যত উপরে উঠছি পা যেন তত টেনে ধরছে নীচে। উপরে শুধু সাদা আকাশ দেখা যায়। ট্রেনের আওয়াজ পাচ্ছি কিন্তু রেললাইন দেখতে পাচ্ছি না কোনও।

সিঁড়ির মাথায় পোঁছে দেখি একটা ছোট্ট টিকিটঘর। এটা আগে তো দেখতে পাইনি। চৌকোমত ঘর, তার ডান দিকে কালো জানলা, ফাঁক দিয়ে আকাশের সাদা দেখা যাচ্ছে। বাঁ দিকে টিকিট কাউন্টার। কটকটে লাল আর ছাই রঙের সানমাইকা আটকানো গুমটি মতন, তাতে স্লাইডিং জানলা। জানলার ওপারে যিনি বসে আছেন তাঁকে দেখতে হুবহু আমার বারো ক্লাসের সাইকোলজি টিউশন দিদিমণির মত। সেই একই গোল মুখ, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল টেনে পনিটেল করা, চিরচেনা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ। খালি উত্তর কলকাতার অন্ধকার প্রাচীন শরিকি বাড়ির দু’টো ঘর নিয়ে থাকা আমার প্রিয় দিদিমণিটি ছিলেন সদাহাস্যময়। ইনি প্রস্তরবৎ। টিকিট কেটে ভাবছি প্ল্যাটফর্ম যাবো কোথা দিয়ে, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই মুখে কিছু না বলে পাশে একটা দরজা দেখিয়ে দিলেন, কাউন্টারের গায়ে। দরজাটা খুলে ঢুকে দেখি তিনি যেখানে বসে আছেন সেখানটাতেই চলে এসেছি। সামনেই আরেকটা দরজা। ভয়ঙ্কর সরু। সেটা খুলে কোনও মতে পাশ পাশ হয়ে ঢুকলাম। পেট আটকে যাচ্ছে দরজার ফ্রেমে, রীতিমত ঠেলাঠেলি করতে হচ্ছে। লজ্জা ঢাকতে ঠাট্টা করলাম, “এসব দরজা মোটা মানুষদের জন্য নয়!” উত্তর নেই। ঠায় তাকিয়ে থাকলেন যতক্ষণ না আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

বেরিয়ে একটা সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ এসে পড়েছি। ভয়ানক নোংরা ধুলোপড়া তুঁতে রঙের দেওয়ালওয়ালা একটা সিঁড়ি। এক দিকে সিঁড়ি নেমে যাচ্ছে, অন্য দিকে উঠে যাচ্ছে। চারপাশ এত ঝুলকালি যে দমবন্ধ হয়ে আসছে। দেওয়াল ভরে ভরে পানের পিক এবং আরও যে কী কী সব আবর্জনা লেপ্টে আছে তার আমি নামও জানি না। উপরের ল্যান্ডিংটায় দেখি একটি মেয়ে মাটিতে উবু হয়ে বসে। তার সামনে একটা লম্বা ঝাঁটা ধরা। কালো রঙের মেয়ে, কাপড়চোপড় শত ময়লা, ঠোঁটদুটো অস্বাভাবিক রকমের কালো। সারা গায়ে এতই ময়লা যে গায়ের এবং কাপড়ের আসল রঙ বোঝাই যাচ্ছে না।জিজ্ঞেস করলাম, কোন দিকে যাব। সে কী একটা বলল, বুঝতে পারলাম না। আবার জিজ্ঞেস করলাম, নীচে যাব? সে বলল হ্যাঁ। আমি নীচে নামতে লাগলাম।

সিঁড়ি ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে এল। আশপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এক একটা ল্যান্ডিং-এ হঠাৎ হঠাৎ আলো এসে পড়ছে অনেক উপরে কোথাও থেকে, আর এক একজনকে দেখতে পাচ্ছি। সবাই কাজ করছে। এক জন লালচে জামা পরা নেপালি চেহারার মহিলা পিঠে বিশাল ভারি মোট নিয়ে ভীষণ ধীরে পা টেনে টেনে উপরে উঠছেন। সেই একইরকম ভীষণ ময়লা মুখ ও পোশাকআশাক।আবার জিজ্ঞেস করলাম কোন দিকে যাব। কী বললেন আবার বুঝতে পারলাম না। ঘাড় ঘুরিয়ে নীচের দিকে দেখলেন একবার। আমি আবারও নামতে লাগলাম। সিঁড়ি আর শেষ হয় না, গুমোট ধুলোর গন্ধে বাতাস ভারী হতে থাকে যত নীচে নামি।

একটা তলায় দেখি একধারে একটা বারান্দা মত বেরিয়েছে, আলো পড়ছে।একটি মেয়ে বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ দেখলেই বোঝা যায় হা-ক্লান্ত। নস্যি রঙের সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা কোমরে পেঁচানো, যেন এতক্ষণ কাজ করছিল খুব সবে একটু ফুরসত পেয়েছে। সেই একইরকম মলিন চেহারা, পোশাক। তাকেও জিজ্ঞেস করলাম, কোন দিকে যাব। কী বলল আবার বুঝতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, কী? এবারে আর উত্তর এল না।

আমি নীচে নেমে গেলাম। হঠাৎ সিঁড়ি শেষ। দরজা দিয়ে বেরিয়ে দেখি একটা সরু জায়গায় এসে পড়েছি। চারপাশে উঁচু উঁচু বাড়ি, সবক’টারই এটা পিছন দিক। হলদে ছাতাপড়া কালো কালো সব দেওয়াল, পাইপ বেরিয়ে এসেছে। মাটিতে সমস্ত ফ্ল্যাট থেকে ছুঁড়ে ছুঁটে ফেলা আবর্জনায় ভরা প্লাস্টিক ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। কয়েকটা মরা পায়রা পড়ে। একটা ছেঁড়া সাদা পাঞ্জাবি পরা লোক, একটা কালো শতচ্ছিন্ন হাফপ্যান্ট পরা ছেলে যার সারা গায়ে দগদগে ঘায়ের চিহ্ন, এক হলদেটে কাপড়ে মুড়িঝুড়ি দেওয়া মহিলা। বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, স্টেশন কোনদিকে? ছেলেটা কিছু একটা বলল, আমি আবার বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম, কী? তিনজনে মিলে হাত দিয়ে পিছনের দিকের একটা অন্ধকার গলি দেখিয়ে দিল।গলিটা জমাট অন্ধকার। মাঝবরাবর একটা নালা চলে গেছে সেটা অবিশ্বাস্য রকমের নোংরা।

আমার হঠাৎ খুব ভয় করতে আরম্ভ করল। আমি ওদের দেখানো দিকে না গিয়ে অন্য দিকটায় যেতে গেলাম।  কিন্তু যাবো কোথায়? সবই তো সরু থেকে সরু গলি। মাটিতে মাছের কাঁটা পড়ে আছে, আর স্বচ্ছ প্লাস্টিকে ভরা মানুষের গু। আমার মনে হল এখান থেকে আর কোনও দিনও বেরোতে পারব না।

সঙ্গের ছবিটি শিল্পী চিহারু শিওতা-র একটি ইনস্টলেশন, ২০১৬ সালে ব্রাসেলস্‌-এ প্রদর্শিত হয়েছিল। ছবিটির উপর গ্রাফিক্স করা হয়েছে, সেইটি আমার অপকীর্তি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s