অনুবাদ: দ্য হাজব্যান্ড স্টিচ, কারমেন মারিয়া মাচাদো

গল্পটা আমি প্রথম পড়ি গ্রান্টা ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণে। কারমেন মারিয়া মাচাদো সম্পর্কে কিচ্ছুটি জানতাম না তখন, এখনও উইকিপিডিয়া পেজের তথ্য ব্যতীত খুব কিছু জানি না। তবে তাঁর নামের পাশে হরর এবং ইরোটিকা শব্দদুটো বসানো হয়। তাঁর অন্য কোনও লেখা এখনও আমার পড়া হয়ে ওঠেনি, কিন্তু এই একটি গল্পের ধুনকি কাটতেও সময় নেয়। এটাকে ফেমিনিস্ট আখ্যান হিসেবে অবশ্যই পড়তে হবে কিন্তু তার থেকেও গভীর স্তরে এই গল্পটা গল্প বলা নিয়ে, গল্পের ক্ষমতা আর রাজনীতি নিয়ে। পুরোনো গল্প  নতুন করে বলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির ভিতরেই পড়ে। এই নতুন করে বলা ‘নতুন’ হয়ে ওঠে মূলত গল্প কথকের কারণে; কে বলছে, কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে, কোন সময়ে বলছে। গল্প  কী ভাবে বদলাতে থাকে, কেন বদলাতে থাকে, গল্পের শরীরে কী ভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে কথকের স্বর, আর সেই স্বর কোন সত্যকে তুলে ধরে, আদৌ ধরে কী? এই সব প্রশ্ন নিয়ে খেলা করে দ্য হাজব্যান্ড স্টিচ। 

একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার বলে মনে হল, কারমেনের কথক নিজেও এক বহু পুরোনো এবং সুপ্রসিদ্ধ শিশুপাঠ্য ভয়ের গল্পের চরিত্র। গল্পের নাম বদলে বদলে যায়; The Green Ribbon, The Girl with the Green Ribbon ইত্যাদি। কখনও বদলে যায় ফিতের রঙ; সবুজ থেকে লাল বা কালো। কিন্তু ধাঁচটা একই – এক কিশোরীর গলা জড়িয়ে থাকা ফিতে যা সে কোনও অবস্থাতেই খুলে রাখে না, এবং সেই ফিতের রহস্য উদ্ধার করতে না পেরে চিন্তিত ও বিভ্রান্ত তার  প্রেমাস্পদ, পরবর্তীতে স্বামী। গল্পটা এখানে পড়ে নিতে পারেন। আর পড়ছেনই যখন গুগ্‌ল্‌-এ husband stitch বলেও একবারে সার্চ দিয়ে নেবেন টুক করে। এবার, গল্প। 

এয়োস্ত্রী সেলাই

কারমেন মারিয়া মাচাদো

(গল্পটা জোরে পড়ে শোনাতে হলে বিভিন্ন চরিত্রের জন্য নিম্নলিখিত স্বরগুলি ব্যবহার করবেন:

আমি: শিশু বয়সে, তীক্ষ্ণ ও সরু, মনে রাখার মত নয়; বড় বয়সে, একই।

যে ছেলেটি বড় হয়ে একদিন লোক হয়ে উঠবে, এবং একদিন আমার স্বামী হবে: নিজ সৌভাগ্যের সুনিশ্চয়তায় দৃঢ় ও বলিষ্ঠ।

আমার বাবা: আপনার বাবা, বা যে মানুষটি আপনার বাবা হলে আপনি খুশি হতেন, তাঁর মত।

আমার ছেলে: শিশু বয়সে, নরম, খুব হালকা আধো আধো টানযুক্ত; বড় হয়ে, আমার স্বামীর মত।

আর সমস্ত মহিলা: আমারটাই বসিয়ে দেবেন।)

শুরুতে, আমি বুঝতে পারি যে আমি তাকে চাই, সে চাওয়ার আগেই। এ ব্যাপারগুলো এভাবে হয় না সাধারণত, কিন্তু আমি এভাবেই করব। বাবা-মার সঙ্গে এক প্রতিবেশীর বাড়ির পার্টিতে এসেছি আমি, আমার বয়স সতেরো। বাবা খেয়াল করেনি, কিন্তু রান্নাঘরে কয়েক মিনিট আগেই আধ গ্লাস হোয়াইট ওয়াইন খেয়ে এসেছি আমি, প্রতিবেশীর কিশোরী মেয়েটির সঙ্গে মিলে। চারপাশটা নরম হয়ে আছে, সদ্য আঁকা তেলরঙের ছবির মত।

ছেলেটি আমার দিকে ফিরে নেই। আমি তার ঘাড় ও পিঠের পেশিগুলো দেখতে পাচ্ছি, বোতাম-আঁটা শার্ট থেকে যেন ফেটে বেরোতে চাইছে তার ভরাট শরীর। আমিও সোজাসাপ্টা খেলছি, মাখনের মত। আর কাউকে পাবো না এমন মোটেই নয়। আমি সুন্দরী। আমার ঠোঁট সুন্দর। আমার বুকজোড়া জামা ঠেলে ইষৎ উঠে থাকে, একইসঙ্গে নিষ্পাপ আর নষ্ট দেখায় কী ভাবে যেন। আমি ভালো মেয়ে, ভালো বাড়ির মেয়ে। কিন্তু সে যেন কেমন একটু ভাঙাচোরা, যেমনটা পুরুষরা কখনও কখনও হয়, আর আমার তাই চাই।

একবার একটা গল্প শুনেছিলাম, একটি মেয়ের গল্প যে তার প্রেমিকের কাছে এমন নোংরা কিছু একটা আবদার করেছিল যে সেই প্রেমিক তার বাড়িতে জানিয়ে দেয়, আর বাড়ি থেকে তাকে পত্রপাঠ পাগলাগারদে ভরে দেওয়া হয়। আমি জানিনা এমন কী নিষিদ্ধ সুখ চেয়েছিল মেয়েটি, কিন্তু জানতে ভয়ানক ইচ্ছে করে। এমন কী সে জাদুবস্তু যা এমন আকুলভাবে চাওয়া যায়, আর যা চাওয়ার জন্য নিজের চেনা জগত থেকে চিরকালের মত এমন ভাবে নির্বাসিত হতে হয়?

ছেলেটি আমায় লক্ষ্য করেছে। ভারি মিষ্টি, একটু থতমত। হ্যালো বলে। আমার নাম জিজ্ঞেস করে।

আমি সবসময়েই ভেবে এসেছি যে নিজের মুহূর্তটা আমি নিজেই বেছে নেব, আর এই মুহূর্তটাকেই আমি বেছে নিলাম।

ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকে চুমু খাই আমি। সে চুমু ফিরিয়ে দেয়, প্রথমে মৃদু, তারপর আরও জোরে, তারপর জিভ দিয়ে আমার ঠোঁটের ভিতরেও কিছুটা ঢুকে আসে। পিছিয়ে যাওয়ার পর তাকে হতভম্ব দেখায়। কয়েক মুহূর্ত এদিক-ওদিক ঘুরে তার দৃষ্টি এসে স্থির হয় আমার গলায়।

– ওটা কী? সে জিজ্ঞেস করে।

– ওঃ, এটা? ঘাড়ের পিছনে আমার ফিতেটার উপর হাত রাখি। ও কিছু না, আমার ফিতে। তার সবুজ, চিক্কণ দৈর্ঘ্য বরাবর আঙুল বুলিয়ে গলার সামনের আঁটোসাঁটো ফুলটির উপর এনে রাখি। সে হাত বাড়ায়, আমি তার বাড়ানো হাত ধরে সরিয়ে দিই।

– ওটায় হাত দেওয়া যায় না, আমি বলি। ওটায় হাত দিতে পারবে না।

ভিতরে যাওয়ার আগে সে আমায় জিজ্ঞেস করে, আবার আমাদের দেখা হবে তো। আমি বলি হলে আমার ভালোই লাগবে। সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমি আবার তাকে কল্পনা করি, ঠোঁটের আগল ঠেলে ঢুকে আসা তার জিভ, আমার আঙুল শরীরের খাঁজে পিছলে যায়, আমি তাকে ঐ জায়গাটায় কল্পনা করি, তার চাপ চাপ পেশী আর আমায় তুষ্ট করার বাসনা নিয়ে, আর আমি জানি একদিন আমাদের বিয়ে হবে।

*

আর, হয়ও। মানে হবে। কিন্তু তার আগে ওর গাড়িতে ও আমায় নেয়, অন্ধকারে, কাদায় গুল্মে ভরা এক দীঘির পাড়ে। সে চুমু খায় আমায়, আমার স্তন আঁকড়ে ধরে, তার আঙুলের চাপে গিঁটের মত শক্ত হয়ে ওঠে আমার বৃন্তমুখ।

ও কী করতে চলেছে সেটা আমার কাছে খুব একটা স্পষ্ট ছিল না যতক্ষণ না করতে শুরু করল। কঠিন, উষ্ণ, রুক্ষ হয়ে ওঠে ওর শরীর, গরম রুটির মত গন্ধ ভেসে আসে, আর যে মুহূর্তে আমায় ও ভাঙে আমি চিৎকার করে উঠে ওকে আঁকড়ে ধরি মহাসমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া নাবিকের মত। আমার শরীরে পেঁচিয়ে গেছে ওর শরীর, ও ঠেলছে, ঠেলছে, আর শেষ হওয়ার ঠিক আগে বার করে নিয়ে সবটা ঢেলে দেয় ও, দেখি আমার রক্তে ও পিচ্ছিল হয়ে আছে। আমায় মুগ্ধ করে ওর ছন্দ, ওর প্রকট কাম, ওর অনাবিল শীর্ষসুখ। পরে, নিজের সিটে এলিয়ে পড়ে সে, আমি দীঘির শব্দ শুনতে পাই: জলের পাখি আর ঝিঁঝির ডাক, আর কিছু একটা যেটা শুনে মনে হয় ব্যাঞ্জোর তারে টান মারা হচ্ছে।জল থেকে হাওয়া উঠে আসে, আমার শরীরকে শীতল করে দেয়।

এখন কী করব আমি জানি না। পায়ের দু’ফাঁকে বুকের ধুকপুক অনুভব করতে পারি। ব্যথা করছে আপাতত, কিন্তু এটাকে ভালো লাগানো সম্ভব বলেই মনে হয়। নিজের শরীরে হাত বোলাই, সুখের শিহরণ ভেসে আসে যেন বহু দূর থেকে। ওর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে, বুঝতে পারি ও আমায় দেখছে। জানলা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে আমার শরীর। ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে এটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারি, দূরে সরতে থাকা সুখটাকে আঁকড়ে ধরার সুযোগ আছে এখনও, হাত ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া বেলুনগুচ্ছের সুতো যেমন আঙুলের ডগায় খেলা করে, ঠিক তেমনই। আমি ঘষি, শীৎকার করি, শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়া অনুভূতির ঢেউয়ের মাথায় নেচে উঠে নেমে আসি, পুরো সময়টা জিভ কামড়ে ধরে থাকে আমার দাঁত।

– আরো চাই আমার, সে বলে। কিন্তু কিছু করার চেষ্টা করে না।

– জানলা দিয়ে ও বাইরে তাকায়, আমিও তাকাই। এই অন্ধকারে কত কিছুই না ঘুরে বেড়াতে পারে, আমি ভাবি। কাটা হাতে হুক লাগানো পাগল একটা। যাত্রাসঙ্গীর খোঁজে থাকা কোনও ভবঘুরে প্রেত। শিশুদের মন্ত্রোচ্চারণে আয়নার ঘুম ভেঙে উঠে আসা কোনও প্রাচীন নারী। এই গল্পগুলো সবাই জানে – মানে সবাই বলে – কিন্তু বিশ্বাস করে না কেউই।

জলের উপর দিয়ে ঘুরে এসে তার নজর আমার গলায় এসে থামে।

– তোমার ফিতেটার কথা বল, সে বলে।

– কিছু বলার নেই। এটা আমার ফিতে।

– আমি ছুঁতে পারি?

– না।

– আমি ছুঁতে চাই, সে বলে।

– না।

জলের ভিতর কিছু একটা লটপট করে লাফিয়ে ওঠে, তারপর আবার ঝপাত করে গিয়ে পড়ে। শব্দ শুনে সে ঘুরে তাকায়।

– মাছ হবে, সে বলে।

– একদিন, আমি বলি, তোমায় এই দীঘি আর তার জন্তুদের গল্প শোনাবো।

সে হাসে, চোয়ালে হাত বুলোয়। আমার রক্ত তার গালে লেগে যায় অল্প, কিন্তু সে খেয়াল করেনি, আর আমিও কিছু বলিনা।

– আমার ভালোই লাগবে, সে বলে।

– বাড়ি নিয়ে চলো, আমি বলি তাকে।

আর খাঁটি ভদ্রলোকের মত, সে তাই করে।

সে রাতে, আমি নিজেকে ধুই। পায়ের ফাঁকে রেশমি সাবানফেনাগুলো বর্ণে গন্ধে মরচের মত লাগে, কিন্তু এত নতুন যেন আমি আগে কখনও ছিলাম না।

*

আমার বাবা-মা ওকে খুবই পছন্দ করেন। বড় ভালো ছেলে, বলেন ওঁরা। ভালো মানুষ হবে। ওর পরিবার, কাজকর্ম, শখআহ্লাদ নিয়ে ওকে নানা প্রশ্ন করেন। সপ্তাহে দু’বার করে বাড়িতে আসে ও, মাঝেমাঝে তিন বার। আমার মা ওকে রাতে খেয়ে যেতে বলেন, আর খাওয়ার সময় ওর পায়ের মাংসে নখ বসাই আমি। বাটির তলায় আইস ক্রিম গলে জল হয়ে এলে পর, আমি বাবা-মাকে বলি ওর সঙ্গে একটু হেঁটে আসছি। রাতের অন্ধকারে হাঁটতে বেরোই আমরা, মিষ্টি করে হাত ধরাধরি করে থাকি, যতক্ষণ না বাড়ি থেকে আর দেখা না যায়। ওর হাত ধরে গাছের সারির ভিতরে টেনে নিয়ে যাই আমি, একটা ফাঁকা জায়গা খুঁজে আমি প্যান্টি খুলে ফেলি, আর চার হাত-পায়ে উপুড় হয়ে বসে নিজেকে ওর কাছে সমর্পণ করে দিই।

আমার মত মেয়েদের সম্পর্কে যা যা গল্প হয় তার সবক’টা আমি শুনেছি, আর এমন আরও গল্প তৈরি করতে আমার ভয় নেই। দু’টো নিয়ম আছে: ভিতরে ফেলতে পারবে না, আর আমার সবুজ ফিতেয় হাত দিতে পারবে না। মাটির উপর বীর্য ছিটকে পড়ে, বৃষ্টি শুরুর মত টপ-টপ-টপাৎ শব্দ করে। আমি নিজেকে স্পর্শ করতে যাই, কিন্তু এতক্ষণ মাটি আঁকড়ে থাকা আমার আঙুলগুলো নোংরা হয়ে আছে। প্যান্টি আর মোজা টেনে তুলি। ও একটা শব্দ করে, আঙুল তুলে দেখায়, আর আমি দেখি যে নাইলনের নীচে আমার হাঁটুও কাদা মাখামাখি হয়ে আছে। আমি মোজা নামাই, কাদা ঝাড়ি, আবার তুলে পরি। স্কার্টের ভাঁজ সোজা করি, চুল গুছিয়ে বাঁধি। ওর টেনে আঁচড়ানো কোঁকড়া চুল থেকে এক গাছি এলো হয়ে এসেছে, সেটাকে তুলে অন্য চুলের সঙ্গে গুঁজে দিই। হেঁটে হেঁটে সোঁতা অবধি যাই আমরা, আর স্রোতে হাত ডুবিয়ে রাখি যতক্ষণ না একদম পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরি আমরা, পবিত্র ভাবে হাত ধরাধরি করে। ভিতরে মা কফি বানিয়েছে, আমরা বসে আছি, আর বাবা ওকে ব্যবসার খবর জিজ্ঞেস করছে।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, এই ফাঁকা জায়গাটার আওয়াজ সবচেয়ে ভালো অনুকরণ করার উপায় হল লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে সেটা একটা দীর্ঘ মুহূর্ত ধরে রাখা। তারপর একবারে সবটা হাওয়া ছেড়ে দিন, যাতে আপনার বুক খেলনা মিনার ভেঙে পড়ে যাওয়ার মত করে নেমে যেতে পারে। বারবার করুন এটা, করতে থাকুন, শ্বাস ধরে রাখা এবং ছাড়ার মধ্যের সময়টা প্রতিবারে একটু করে কমিয়ে আনুন।)

*

বরাবর গল্প-বলিয়ে ছিলাম আমি। যখন খুব ছোট, মাকে একদিন আমায় মুদিখানা দোকান থেকে কোলে চাপিয়ে বার করে আনতে হয়েছিল, আমি প্রাণপণে চিৎকার করছিলাম যে সবজিপাতির জায়গাটায় একটা বুড়ো আঙুল রাখা রয়েছে। চারপাশ থেকে উদ্বিগ্ন মুখে মহিলারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন আমি হাওয়ায় পা ছুঁড়ছি আর মায়ের তন্বী পিঠে দুম দুম করে ঘুষি চালাচ্ছি।

– আলু ওগুলো! বাড়ি ফেরার পর মা আমায় ঠিক করে দেয়। আঙুল নয়!

মা আমায় আমার চেয়ারে গিয়ে বসতে বলে – বাচ্চাদের চেয়ার একটা, আমার মাপমত বানানো – যতক্ষণ না বাবা ফিরছে। কিন্তু না, আমি বুড়ো আঙুলগুলো দেখেছি, ফ্যাকাশে রক্তাক্ত টুকরো সব, খয়েরি আলুগুলোর ভিতরে মিলেমিশে ছিল। তাদের মধ্যে যেটায় আমি এক আঙুল দিয়ে টিপে দেখেছিলাম, সেটা ছিল বরফের মত ঠান্ডা, আর আমার আঙুলের চাপে জলঠোসার মত দেবে গিয়েছিল। মাকে যখন এই কথাটা বললাম, মায়ের চোখের জল জল অংশটা হতচকিত বেড়ালের মত দ্রুত কেঁপে উঠল একবার।

– চুপ করে এখানে বস, মা বলল।

সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বাবা আমার পুরো গল্পটা মন দিয়ে শুনল।

– তুমি তো মিস্টার বার্নস-কে দেখেছো, তাই না? বাবা আমায় জিজ্ঞেস করে, যে বৃদ্ধ মানুষটি ঐ দোকানটি চালাতেন তাঁকে উল্লেখ করে।

আমি তাঁকে একবার দেখেছি, সেটাই বাবাকে বলি। বরফ পড়ার ঠিক আগের আকাশের মত সাদা তাঁর চুল, আর তাঁর এক স্ত্রী আছেন যিনি দোকানের বাইরের সাইনগুলো লেখেন।

– মিস্টার বার্নস খামোখা আঙুল বেচতে যাবেনই বা কেন? বাবা আমায় জিজ্ঞেস করে। উনি ওসব পাবেন কোথায়?

ছোট ছিলাম, কবরখানা বা মর্গ সম্পর্কে তখন কোনও ধারণাও ছিল না, তাই উত্তর দিতে পারিনি।

– আর যদি কোথাও থেকে জোগাড় করেও থাকেন, আলুর সঙ্গে বুড়ো আঙুল মিশিয়ে বেচে ওনার লাভটা কী?

ওগুলো ছিল ওখানে। আমি নিজের চোখে ওগুলো দেখেছি। কিন্তু বাবার যুক্তির সূর্যকরোজ্জ্বল ছটার সামনে আমার সংশয় ডানা মেলতে লাগল।

– সবচেয়ে বড় কথা, চূড়ান্ত প্রমাণটির সামনে বিজয়গর্বে এসে দাঁড়িয়ে বাবা বলল, তুমি ছাড়া আর কেউ কেন ওগুলো দেখতে পেল না?

বড় বয়সের আমি বাবাকে বলতে পারতাম, পৃথিবীতে এমন সত্যও আছে যা শুধু একটি জোড়া চোখেই প্রতিভাত হয়। ছোট আমি বাবার ব্যাখ্যাটা মেনে নিয়েছিলাম, আর বাবা যখন চেয়ার থেকে হুশ করে কোলে তুলে নিয়ে আমায় হামি দিয়ে শান্ত করে দেয় আমি খিলিখিলিয়ে হেসে উঠেছিলাম।

*

একটি মেয়ে তার পুরুষকে শেখাবে সেটা স্বাভাবিক নয়, কিন্তু আমি ওকে শুধু এটুকুই দেখাচ্ছি যে আমি কী চাই, ঘুমিয়ে পড়লে আমার চোখের পাতার তলায় কী চলে। শরীরের ভিতর দিয়ে নতুন কোনও ইচ্ছের স্রোত বয়ে যাওয়ার সময় আমার চোখের তড়িৎভাষ্য পড়তে শিখে যায় সে, আমিও তাকে অদেয় কিছু রাখি না। ও যখন আমায় বলে ও আমার মুখটা, আমার গলার ভিতরটা পর্যন্ত চায়, আমি নিজেকে বমি আটকাতে শেখাই আর ওকে পুরো ভিতর পর্যন্ত গ্রহণ করি, মুখের ভিতর নোনতা স্বাদটার চারপাশে শীৎকার বুনে দিই। সে যখন আমার সবচেয়ে ভয়াবহ গুপ্তকথাটা জানতে চায়, আমি তাকে সেই শিক্ষকের কথাও বলে দিই যে বাকিরা চলে যাওয়া অব্দি আমায় আলমারিতে বন্ধ করে রেখেছিল আর তারপর আমায় ওর ঐখানটা ধরতে বাধ্য করেছিল, আর তারপর কীভাবে আমি বাড়ি ফিরে তারের জালি দিয়ে হাত ঘষেছিলাম রক্ত বেরোনো পর্যন্ত – যদিও এটা ওকে বলার পর টানা একমাস আমি দুঃস্বপ্ন দেখি। আর, যখন আমার ১৮ বছরের জন্মদিনের দিন কয়েক আগে সে আমায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়, আমি বলি হ্যাঁ, হ্যাঁ, একশবার হ্যাঁ, আর তারপর সেই পার্কের বেঞ্চের উপর ওর কোলে উঠে বসে স্কার্টের ঘেরটাকে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে দিই, যাতে পাশ দিয়ে কেউ গেলে বুঝতে পারবে না তলায় কী চলছে।

– মনে হয় তোমার ভিতরের কত কত জিনিস আমি জেনে গেছি, হাঁপানি লুকোনোর চেষ্টা করতে করতে ও বলে। আর এবার, আমি সবকিছু জেনে যাব।

*

একটা গল্প আছে, যেখানে একটি মেয়েকে তার বন্ধুরা বাজি দিয়েছিল আঁধার নামার পর একটা স্থানীয় কবরখানায় যেতে। তার ভুল হয়েছিল এটাই: ওরা যখন তাকে বলে রাতের বেলা কোনও কবরের উপর গিয়ে দাঁড়ালে সেই কবরের বাসিন্দা উঠে এসে তাকে টেনে নিয়ে যাবে, সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। উপহাস হল প্রথম ভুল যা কোনও মেয়ে করতে পারে।

আমি তোদের দেখিয়ে দেব, সে বলেছিল।

ঔদ্ধত্য হল দ্বিতীয় ভুল।

তারা তাকে একটা ছুরি দেয় বরফকঠিন মাটিতে গেঁথে আসার জন্য, তার উপস্থিতি এবং তার দাবির সত্যতার প্রমাণ হিসেবে।

সে ঐ কবরখানায় গেছিল। কেউ কেউ বলে সে যেমন তেমন একটা কবর বেছে নিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি সে একটা খুব পুরোনো কবর বেছেছিল আসলে, তার এই সিদ্ধান্তে ইন্ধন দিয়েছিল তার আত্মপ্রত্যয়ের অভাব, এবং একটা নিহিত ধারণা যে যদি কোনওভাবে সে ভুল হয় তাহলে কয়েকশো বছরের পুরোনো মড়ার থেকে পেশী-মাংস পুরোপুরি খসে না যাওয়া নতুন কোনও মড়া বেশি বিপজ্জনক হবে।

কবরের উপর হাঁটু মুড়ে বসে সে ছুরিটা গভীরে পুঁতে দেয়। উঠে দাঁড়িয়ে পালাতে গিয়ে দেখে সে পারছে না। কে যেন তার কাপড় টেনে ধরে আছে। চিৎকার করে উঠে পড়ে যায় সে।

সকাল হলে তার বন্ধুরা কবরখানায় আসে। তাকে কবরের উপর মৃত অবস্থায় পায় তারা, তার শক্তপোক্ত উলের স্কার্ট ছুরিটা দিয়ে মাটিতে গাঁথা। ভয়ে মরেছে না শীতে, তার বাবা-মা একবার এসে পৌঁছলে এই প্রশ্নটার কি আর কোনও মানে থাকবে? সে ভুল ছিল না, কিন্তু তাতে আর কিছু যায় আসে না। পরে, সবাই এটা বিশ্বাস করতে শুরু করল তার মরারই ইচ্ছা ছিল, যদিও সে মরেই প্রমাণ করেছিল যে সে বাঁচতে পারত।

যা বোঝা গেল, ঠিক হওয়াটা ছিল তার তৃতীয়, এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ভুল।

*

আমার বাবা-মা বিয়েটা নিয়ে খুশি। মা বলে, আজকাল যদিও মেয়েদের দেরিতে বিয়ে করার হাওয়া উঠেছে, মা নিজে কিন্তু বাবাকে বিয়ে করেছিল উনিশ বছর বয়সে, আর ভালোই করেছিল।

বিয়ের গাউন বাছার সময় আমার সেই মেয়েটির গল্প মনে পড়ে যায় যে তার প্রেমাস্পদের সঙ্গে নাচতে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু ভালো জামা কেনার তার পয়সা ছিল না। তাই সে একটা পুরনো জিনিসের দোকান থেকে ভারি সুন্দর দেখতে সাদা একটা ফ্রক কিনে নিয়ে আসে, এবং পরে অসুস্থ হয়ে পড়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নেয়। যে করোনার তার অটোপসি করেছিলেন তিনি জানান, শব সংরক্ষণের তরল থেকে মৃত্যু হয়েছে তার। পরে বোঝা যায়, কোন এক সৎকার কোম্পানির কোনও এক অসাধু কর্মী এক কনের মৃতদেহ থেকে ঐ গাউনটি চুরি করেছিল।

আমার মনে হয়, এই গল্পটার নীতিকথা হল দারিদ্র্য মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে। বা হয়তো গল্পের দুনিয়ায় কনেদের ভাগ্য কখনও প্রসন্ন হয় না, আর সেইজন্যই হয় কনে হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে, নয়তো গল্পের চরিত্র হওয়া থেকে। আসলে, গল্পরা আনন্দের গন্ধ বুঝতে পারে, আর তাকে মোমের মত এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিতে দেরি করে না।

আমাদের বিয়ে হয় এপ্রিলে, মরসুমের পক্ষে অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা এক বিকেলবেলায়। বিয়ের আগে ও আমায় দেখে ফেলে, বিয়ের গাউন পরিহিত অবস্থায়, আর জোর করে সাপটে চুমু খায় আমায়, বডিসের ভিতর ঢুকিয়ে দেয় হাত। তার ওখানটা শক্ত হয়ে ওঠে, আর আমি তাকে জানাই যেভাবে খুশি আমায় ব্যবহার করতে পারে সে। উপলক্ষের দাবি, তাই আমার প্রথম নিয়মটা শিথিল করি আমি। আমায় দেওয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে ও, টাল সামলাতে আমার গলার কাছটায় দেওয়ালের টালির উপর হাত রাখে। ওর বুড়ো আঙুল আমার ফিতে স্পর্শ করে। ও হাত নাড়ায় না অবশ্য, আর আমার ভিতরে ওঠানামা করতে করতে ক্রমাগত বলে চলে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। জানি না আমিই প্রথম মেয়ে কিনা যে সেন্ট জর্জের দরদালানে পা বেয়ে বীর্য গড়িয়ে পড়তে পড়তে হেঁটেছে, তবে আমার সেটাই ভাবতে ভালো লাগে।

*

হনিমুনের জন্য আমরা যেখানে যাই সেটা আমার বহু দিনের ইচ্ছে: সারা ইউরোপ ভ্রমণ। আমরা বড়লোক নই, কিন্তু ব্যবস্থা ঠিকই হয়ে যায়। প্রাচীন, ঘিঞ্জি শহর থেকে ঘুম ঘুম গ্রাম, আল্পীয় পর্বতমালার কোল ছুঁয়ে আবার ফেরত; হরেক নতুন মদে চুমুক আর রোস্টের হাড় থেকে মাংস দাঁতে ছিঁড়ে নেওয়া; স্প্যাৎজেল আর অলিভ আর র‍্যাভিওলি আর ননীর মত এক ধরণের দানাশস্য যেটা আমি চিনি না, কিন্তু রোজ সকালে খেতে ভীষণ ইচ্ছে করে। ট্রেনে নিজস্ব স্লিপার কোচ ভাড়া করার সাম্যর্থ আমাদের নেই, কিন্তু আমার স্বামী একজন অ্যাটেনডেন্টকে ঘুষ দিয়ে একটা ফাঁকা ঘরে এক ঘণ্টা সময় বার করে, আর আমরা রাইন নদীর উপর মৈথুনটা সেরে নিতে সফল হই।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, ট্রেন আর রমণের গতির টানাপোড়েনে বিছানার শব্দটা অনুকরণ করতে একটা লোহার ফোল্ডিং চেয়ারের কবজার উপর চাপ দিতে থাকুন। করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে কথা ভুলে যাওয়া কোনও পুরোনো গান গাইতে থাকুন, মনে মনে ভাবুন শিশুদের ঘুমপাড়ানি গানের কথা।)

*

ঘুরে আসার অল্পদিনের মধ্যেই আমার মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। এক রাতে রতিক্লান্ত বিছানায় পড়ে থাকতে থাকতে আমি আমার বরকে জানাই। সে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।

– একটা বাচ্চা, সে বলে। মাথার নীচে হাত দিয়ে সে গা এলিয়ে দেয়। একটা বাচ্চা। তার পর এতক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ নেই যে আমি ভাবি ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু তাকিয়ে দেখি ওর চোখ খোলা, সিলিং-এর দিকে নিবদ্ধ। পাশ ফিরে আমার দিকে তাকায় ও।

– বাচ্চাটারও কি ফিতে থাকবে একটা?

আমি বুঝতে পারি আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। মাথায় অনেকগুলো উত্তর খেলে যায়, আমি সেটাই বেছে নিই যেটায় আমার সবচেয়ে কম রাগ হচ্ছে।

– এখন তো বলার উপায় নেই, আমি শেষপর্যন্ত বলি।

আমাকে চমকে দিয়ে ও আমার গলায় হাত বোলায় তখন। হাত তুলে ওকে আটকাতে যাই কিন্তু ও জোর খাটায়, এক হাতে আমার কবজিদুটো ধরে রেখে অন্য হাত আমার ফিতেয় রাখে। রেশমি দৈর্ঘ্যের সবটুকুতে বুড়ো আঙুল চেপে বোলায়। বাঁধা ফুলটায় যত্নে হাত রাখে, যেন আমার যোনিকে আদর করছে।

– প্লিজ, আমি বলি, প্লিজ না।

ও যেন শুনতেই পায় না। প্লিজ, আমি আবার বলি, আরও জোরে, কিন্তু আমার গলা ভেঙে যায়।

ও তখনই করে ফেলতে পারত, ফুলটা খুলে দিতে পারত, যদি চাইত। কিন্তু আমায় ছেড়ে দিয়ে পাশ ফিরে শোয় ও। আমার কবজি ব্যথা করে, মালিশ করি।

– আমার জল খেতে লাগবে, আমি বলি। উঠে বাথরুমে যাই। কল খুলে দিই, তারপর উন্মত্তের মত ফিতেটা ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করতে থাকি, চোখের পাতায় কান্না বিন্দু বিন্দু হয়ে আটকে যায়। ফুলটা এখনও আঁটোই আছে।

*

একটা গল্প আছে আমার খুব পছন্দের, এক মাটি-কাটা মজুর দম্পতিকে নিয়ে যাদের নেকড়েয় খেয়েছিল। প্রতিবেশীরা তাদের ছোট্ট কুঁড়ের ভিতর তাদের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকতে আবিষ্কার করে, কিন্তু তাদের ছোট্ট মেয়েটির কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না, জীবিত কি মৃত। পরবর্তীকালে লোকে বলে তারা মেয়েটিকে একটা নেকড়ের দলের সঙ্গে ছুটতে দেখেছে, তার সঙ্গীদের মতই বন্য আর জান্তব ভাবে মাটির উপর নুয়ে পড়ে সে ছুটন্ত অবস্থায়।

আশপাশের গ্রামে তার খবর ছড়াতে থাকে। শীতের জঙ্গলে এক শিকারীকে একবার সে আহত করে – তবে শিকারী বোধহয় আহতের থেকে আশ্চর্যই বেশি হয়েছিল একটা খুদে ন্যাংটো মেয়েকে দাঁত বার করে হুঙ্কার ছাড়তে দেখে। তারপর একটা ঘোড়াকে মারার চেষ্টায় রত এক তরুণী। কেউ কেউ তাকে পালকের ঝড় তুলে একটা মুরগিকে টেনে ছিঁড়ে ফেলতেও দেখেছিল।

বহু বছর পরে, তাকে নাকি দেখা গিয়েছিল নদীর ধারে নলখাগড়ার মধ্যে বসে দু’টি নেকড়ের ছানাকে বুকের দুধ দিচ্ছে। আমার ভাবতে ভালো লাগে ওরা তার শরীর থেকেই এসেছিল, নেকড়েদের বংশগতি এই একটিবার মানুষের দ্বারা কলঙ্কিত হয়েছিল। ওরা তার বুকদু’টোকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল, কিন্তু তার তাতে কিছু যায় আসেনি, ওরা তো ওর, এবং শুধুমাত্র ওরই।

*

আমার পেট ফুলে ওঠে। আমার ভিতরে, আমার বাচ্চা দুরন্ত ভাবে সাঁতার দিচ্ছে, লাথাচ্ছে, ঠেলছে, আঁচড়াচ্ছে। একবার পার্কে হাঁটতে গেছি, সেই একই পার্কে যেখানে এক বছর আগে আমার বর আমায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, হঠাৎ খাবি খেয়ে হেলে পড়ি আমি, পেট আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে আমার খুদে মানুষটাকে থামতে বলি। হাঁটু মুড়ে বসি, জোরে জোরে শ্বাস পড়ে, কান্না ফেটে বেরিয়ে আসে। পাশ দিয়ে যাওয়া এক মহিলা আমায় তুলে বসান, জল খেতে দেন, আর বলেন প্রথম বার বাচ্চা হওয়াটা সব সময়েই সবচেয়ে কষ্টের।

আমার শরীর এমন এমন ভাবে বদলে যায় যা আমার সবরকম ধারণার বাইরে – আমার স্তন বড় হয়ে ফুলে গেছে, গরম হয়ে আছে, আমার পেটে ফ্যাকাশে ফ্যাকাশে দাগ, যেন বাঘের মত ডোরাকাটা তবে উলটো রঙে। নিজেকে রাক্ষসী লাগে, কিন্তু আমার বরের কাম দেখি নতুন করে বেড়ে উঠেছে, যেন আমার এই নতুন শরীরটা আমাদের নিষিদ্ধ রতির তালিকাটায় নতুন জোয়ার এনেছে। আর আমার শরীরও সাড়া দেয়: সুপারমার্কেটের লাইনে দাঁড়িয়ে, চার্চে কমিউনিয়ন নেওয়ার সময়, এক নতুন আর দুর্দান্ত কামনা আমায় আচ্ছন্ন করে, ন্যূনতম প্ররোচণাতেই ভিজে পিচ্ছিল করে দেয় আমায়। প্রতিদিন বাড়ি ফিরে আমার স্বামী নতুন নতুন চাহিদার তালিকা পেশ করে, আর আমি তাকে সেই সব এবং তারও বেশি দিতে উৎসুক হয়ে থাকি।

– আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ, সে বলে, আমার পেটের উপর হাত বোলাতে বোলাতে।

সকালবেলা কফি আর টোস্টের আগেই সে আমায় চুমু খায়, সোহাগ করে, কখনও কখনও নেয়ও। কাজে বেরোয় যখন ওর চলনে যেন এক নতুন তেজ। বাড়ি ফেরে একটার পর একটা প্রোমোশন নিয়ে। আমার পরিবারের জন্য আরও বেশি অর্থ, সে বলে। আমাদের সুখের জন্য আরও আরও অর্থ।

*

আমার প্রসব যন্ত্রণা চলে কুড়ি ঘণ্টা ধরে। আমার বরের হাত টেনে প্রায় ছিঁড়ে নিই আমি, যে সব অকথ্য গালাগাল মুখ থেকে বেরোয় তাতে নার্স কিছুমাত্র অবাক হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমি নিশ্চিত যে চেপে চেপে দাঁতগুলো গুঁড়োই করে ফেলব আমি। ডাক্তার নীচু হয়ে আমার পায়ে ফাঁকে তাকান, তাঁর সাদা ভুরুজোড়া কপালের উপর দুর্বোধ্য সংকেত লিখতে থাকে।

– কী হচ্ছে? আমি জিজ্ঞেস করি।

–  আমার মনে হচ্ছে না স্বাভাবিক ভাবে প্রসব হবে। সার্জারি করতে হতে পারে।

– না, প্লিজ, আমি সেটা চাই না, প্লিজ।

– আর কিছুক্ষণে যদি নড়াচড়া শুরু না হয়, আমরা সেটাই করব, ডাক্তার বলেন। সেটা হয়তো সবার জন্যই ভালো হবে। উনি মুখ তোলেন আর আমি প্রায় নিশ্চিত যে আমার স্বামীর দিকে তাকিয়ে এক চোখ টেপেন, কিন্তু যন্ত্রণায় তো মস্তিষ্ক বাস্তবের চেয়ে আলাদা ভাবে দেখে সবকিছু।

মনে মনে, আমি খুদে মানুষের সঙ্গে একটা চুক্তি করি। খুদে মানুষ, আমি ভাবি, তোর আর আমার এই দু’জনার সময়টুকু এইখানেই শেষ। আমার ভিতর থেকে তোকে কেটে বার করতে এদের দিস না।

২০ মিনিট বাদে খুদে মানুষের জন্ম হয়। ওদের কাটতে হয় বটে, তবে পেটের উপরে নয় যেমনটা আমি ভয় পেয়েছিলাম। ডাক্তার কাটেন নীচে, আমি খুব একটা অনুভব করতে পারি না, খালি একটু টান পড়ে, তবে সেটা বোধহয় আমায় যে সব খাইয়েছিল তার সৌজন্যে। বাচ্চাকে যখন আমার হাতে দেয়, ওর কোঁচকানো শরীরটা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে দেখি আমি, সূর্যাস্তের আকাশের মত রঙ, মাঝে মাঝে লালের ছোঁয়া।

ফিতে নেই, ছেলে হয়েছে। আমি কাঁদতে শুরু করি, আমার অকলঙ্কিত বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, শ্রোতার হাতে একটা কাগজ কাটার ছুরি দিন আর আপনার বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝের নরম চামড়াটা কাটতে বলুন। পরে, তাকে ধন্যবাদ জানান।)

*

একটি মেয়ের গল্প আছে যার প্রসব বেদনা উঠেছিল তার ডাক্তার খুব ক্লান্ত থাকার সময়। একটি মেয়ের গল্প আছে যে নিজেই সময়ের অনেক আগে জন্মে গেছিল। একটি মেয়ের গল্প আছে যার শরীর তার বাচ্চার সঙ্গে এমনি জুড়ে গেছিল যে তাকে কেটে সেই বাচ্চাকে উদ্ধার করতে হয়। একটি মেয়ের গল্প আছে যে একটি মেয়ের গল্প শুনেছিল যে গোপনে নেকড়ে ছানাদের দুধ খাওয়াতো। গল্পদের চরিত্রই হল পুকুরে বৃষ্টিফোঁটার মত মিলেমিশে যাওয়া। মেঘ থেকে তারা আলাদা আলাদা জন্মায়, কিন্তু একবার একসাথে হলে আর আলাদা করার উপায় থাকে না।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, শ্রোতাদের কাছে এই শেষ বক্তব্যটি প্রমাণ করতে জানলার পর্দা সরিয়ে দিন। আমি কথা দিচ্ছি, বৃষ্টি পড়বেই।)

*

যেখানে কেটেছিল সেটাকে ঠিক করার জন্য বাচ্চাকে ওরা সরিয়ে নিয়ে যায়। নাক আর মুখের উপর আলগা করে চাপিয়ে দেওয়া একটা মাস্কের ভিতর দিয়ে আমায় কিছু একটা দেয় যাতে আমার খুব ঘুম পায়। এক হাতে আমার হাত ধরে রেখে ডাক্তারের সঙ্গে ঠাট্টাইয়ার্কি করতে থাকে আমার বর।

– ঐ বাড়তি সেলাইটার কত পড়বে? আপনারা ওটা করান তো?

– প্লিজ, আমি বলতে চাই। কিন্তু সেটা জড়িয়ে মড়িয়ে বিকৃত ভাবে বেরোয়, একটা ছোট্ট গোঙানির চেয়ে বেশি কিছুই হয়তো শোনা যায় না। দু’জন পুরুষের কেউই আমার দিকে ফেরে না।

ডাক্তার মুচকি হাসেন। আপনিই প্রথম নন –

একটা লম্বা সুড়ঙ্গের মধ্যে নেমে যাই আমি, আবার উঠে আসি, কিন্তু আমার সর্বাঙ্গে ভারি আর কালো কিছু একটা লেপ্টে আছে, তেলের মত। বমি হবে বলে মনে হয়।

– বাজারে যেটা খবর…

– একদম ভার্জি…

আর তারপরেই আমি জেগে উঠি, পুরোপুরি জেগে উঠি, আমার বর চলে গেছে, ডাক্তারও চলে গেছে। আর আমার বাচ্চা, কোথায় আমার …

দরজা দিয়ে নার্সের মাথা উঁকি মারে।

– আপনার বর এইমাত্র কফি খেতে গেল, সে বলে, বাচ্চা দোলনায় ঘুমোচ্ছে।

তার পিছন পিছন ডাক্তার ঢোকেন, একটা কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে।

– সবটা সেলাই হয়ে গেছে, একদম ভয় পাবেন না, তিনি বলেন। সুন্দর, আঁটোসাঁটো একেবারে, সবাই খুশি আছে। নার্স আপনার সেরে ওঠার নিয়মকানুন বুঝিয়ে দেবে। এবার কিছু দিন আপনার পুরোপুরি বিশ্রাম দরকার।

বাচ্চা জেগে ওঠে। নার্স তাকে তার দোলনা থেকে তুলে আমার কোলে দেয় আবার। এত সুন্দর যে নিজেকেই নিজে মনে করাতে হয় শ্বাস নিতে হবে বলে।

*

আমার ছেলে ভারি ভালো বাচ্চা। সে খালি বাড়ে আর বাড়ে। আমাদের আর কোনও দিন বাচ্চা হয়না, যদিও চেষ্টার অভাবে নয়। সন্দেহ হয়, খুদে মানুষ আমার শরীরের ভিতরটা এমন তছনছ করে দিয়েছিল যে আরেকজনের থাকার আর জায়গা হয়নি।

– ভারী বদ ভাড়াটে ছিলি রে খুদে, ওর নরম খয়েরি চুলে শ্যাম্পু ঘসতে ঘসতে বলি আমি, জামানত জব্দ করে নেব তোর।

সিঙ্কের ভিতর জল ছপছপিয়ে কলকল করতে করতে মহানন্দে খেলে বেড়ায় সে।

আমার ছেলে আমার ফিতেটায় হাত দেয়, কিন্তু কখনওই এমন ভাবে নয় যাতে আমার ভয় করে। ওটাকে ও আমার অংশ হিসেবেই ভাবে, কান বা আঙুলের চেয়ে আলাদা কিছু নয়।

অফিস থেকে ফিরে আমার বর ছেলের সঙ্গে উঠোনে খেলা করে, ধরাধরি, ছুটোছুটি খেলা। বল লোফার পক্ষে এখনও খুবই ছোট, কিন্তু আমার বর ধৈর্য্য ধরে বার বার ঘাসের উপর দিয়ে ওর দিকে বল গড়িয়ে দিতে থাকে, আর ও সেটা তুলে আবার ফেলে দেয়, আর আমার বর আমার দিকে ইশারা করে, দেখো দেখো! দেখলে? শিগগিরিই বল ছুঁড়তে শিখে যাবে ব্যাটা!

*

মায়েদের সম্পর্কে যে সব গল্প আমি জানি, তাদের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বাস্তব। এক অল্পবয়সী মার্কিন মেয়ে তার মায়ের সঙ্গে প্যারিস ঘুরতে এসেছে, এমন সময়ে মহিলা অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। ওরা স্থির করে কয়েকদিন একটা হোটেলে থেকে নেবে যাতে মা একটু বিশ্রাম নিতে পারেন, আর মেয়ে ডাক্তার ডাকে তাঁকে দেখার জন্য।

অল্পক্ষণ দেখে ডাক্তার বলেন, একটু ওষুধ পেলেই মা ঠিক হয়ে যাবেন। মেয়েকে নিয়ে তিনি একটা ট্যাক্সির কাছে যান, ড্রাইভারকে ফরাসিতে রাস্তা বুঝিয়ে দেন, এবং মেয়েটিকে বলেন যে তাঁর বাড়িতে তাঁর স্ত্রী তাকে যথাযথ ওষুধটি দিয়ে দেবেন। গাড়ি অনেকক্ষণ ধরে চলে আর চলে, আর পৌঁছনোর পর, ডাক্তারের বৌয়ের অসহ্য ঢিমে তালে টুক টুক করে পাউডার থেকে বড়ি তৈরিতে অধৈর্য হয়ে পড়ে সে। ট্যাক্সিতে ফেরার পর ড্রাইভার তাকে নিয়ে চলে এ গলি থেকে সে গলি, কখনও একই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আসে। মেয়েটি ট্যাক্সি ছেড়ে পায়ে হেঁটে হোটেলে ফেরে। শেষ পর্যন্ত যখন সে এসে পৌঁছয়, হোটেলের ক্লার্কটি তাকে বলে সে মেয়েটিকে এর আগে কোনও দিন দেখেনি। সে যখন ছুটে সেই ঘরটিতে পৌঁছয় যেখানে তার মা বিশ্রাম নিচ্ছেন, সে দেখে যে দেওয়ালগুলোর রঙ আলাদা, ঘরের আসবাব তার স্মৃতির মত নয়, এবং তার মায়ের কোনও চিহ্নমাত্র নেই।

গল্পটার একাধিক শেষ আছে। তার মধ্যে একটায়, মেয়েটি দারুণ অদম্য এবং সুনিশ্চিত, কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে সে হোটেলের উপর নজর রাখতে শুরু করে, এবং অবশেষে হোটেলের ধোলাইখানায় কাজ করা এক যুবককে পটিয়ে আবিষ্কার করে সত্যিটা: তার মা মারা গেছেন এক বীভৎস সংক্রামক এবং মারণ রোগে, ডাক্তার মেয়েটিকে ওষুধ আনতে পাঠানোর অল্পক্ষণের মধ্যেই তিনি পরলোক গমন করেন। শহরজুড়ে হইচই আটকাতে হোটেলের কর্মীরা মায়ের দেহ সেখান থেকে সরিয়ে দাহ করে দেয়, হোটেলের ঘরে নতুন রঙ করে আসবাব পালটে দেয়, আর সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঘুষ দিয়ে পাখি পড়িয়ে রাখে যাতে মা-মেয়েকে সবাই না চেনার ভান করে।

গল্পের আর একটা সংস্করণে, মেয়েটি বছরের পর বছর প্যারিসের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, তার স্থির বিশ্বাস জন্মায় যে সে উন্মাদ, তার মা এবং মায়ের সঙ্গে তার যে জীবন সে সবটাই তার অসুস্থ মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র। এ হোটেল থেকে ও হোটেল ঘুরে মরে মেয়েটি, উদ্ভ্রান্ত, শোকস্তব্ধ, যদিও কার জন্য শোক সে তা জানে না।

এই গল্পের নীতিকথা বলে দেওয়ার দরকার নেই। আমার মনে হয় আপনি এতক্ষণে বুঝে গেছেন।

*

আমাদের ছেলে স্কুলে যেতে শুরু করে পাঁচ বছর বয়সে, তার দিদিমণিকে আমি চিনতে পারি, সেই যে সে দিন পার্কে যিনি মাটিতে বসে আমায় সাহায্য করেছিলেন। ওঁরও দেখি আমায় মনে আছে। আমি ওঁকে জানাই যে ছেলের পর আমাদের আর বাচ্চাকাচ্চা হয়নি, আর সেও এখন স্কুলে যেতে শুরু করল, আমার একঘেয়েমি আর আলসেমির দিন শুরু হল বলে। তিনি বলেন, সময় কাটানোর উপায় খুঁজলে, কাছের একটা কলেজে মহিলাদের জন্য একটা খুব ভালো আর্ট ক্লাস আছে।

সে রাতে, ছেলে ঘুমিয়ে পড়ার পর, আমার বর সোফার ওদিক থেকে হাত বাড়িয়ে আমার পায়ে বোলায়।

– এদিকে এস, সে বলে, আর আমি সুখে শিউরে উঠি। সোফা থেকে পিছলে নেমে মনোরম ভাবে স্কার্টের ভাঁজ ঠিক করতে করতে হাঁটু ঘষে ঘষে তার দিকে এগোই। হাত বেল্টের দিকে এগোতে এগোতে ওর পায়ে চুমু খাই, আর সব আঁটবাঁধন খুলে ফেলে ওর পুরোটা গিলে নিই। আমার চুলে বিলি কাটে ওর হাত, কপালে সরে সরে যায়, আর গোঙাতে গোঙাতে আমাকে আরও বেশি করে নিজের সঙ্গে ঠেসে ধরে সে। আমি বুঝতে পারিনি কখন ওর হাত আমার ঘাড় বেয়ে নামতে শুরু করেছে, যতক্ষণ না ওর আঙুলগুলো আমার ফিতের ফুলে জড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। আমি আঁতকে উঠে চকিতে সরে আসি, কোনওক্রমে সরে গিয়ে বাঁধন ঠিক আছে কিনা পরখ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সে এখনও বসে আছে, আমার লালায় মাখামাখি।

– এখানে ফিরে এস, সে বলে।

– না, আমি বলি।

ও উঠে দাঁড়ায়, প্যান্টের ভিতরে ঢুকিয়ে চেন টেনে নেয়।

– একজন স্ত্রীয়ের তার স্বামীর কাছে কোনও কিছু গোপনীয় থাকতে পারে না, সে বলে।

– আমার কোনও কিছু গোপনীয় নেই, আমি বলি।

– ফিতেটা।

– ফিতেটা কোনও গোপন কথা নয়, ওটা শুধুই আমার।

– ওটা কি জন্ম থেকেই ছিল? গলাতেই কেন? সবুজ রঙের কেন?

আমি উত্তর দিই না।

একটা দীর্ঘ মিনিট ও চুপ করে থাকে। তারপর,

– একজন স্ত্রীয়ের তার স্বামীর কাছে কোনও কিছু গোপনীয় থাকতে পারে না।

আমার নাক গরম হয়ে যায়। আমি কাঁদতে চাই না।

– তুমি যা যা চেয়েছ সব আমি তোমায় দিয়েছি, আমি বলি। এই একটা জিনিস কি আমার থাকতে পারে না?

– আমি জানতে চাই।

– তোমার মনে হয় তুমি জানতে চাও, আমি বলি, কিন্তু আসলে চাও না।

– তুমি ওটা আমার থেকে লুকোতে কেন চাইছ?

– আমি লুকোচ্ছি না। শুধু ওটা তোমার নয়।

ও নীচে নেমে আমার খুব কাছে আসে, দামি হুইস্কির গন্ধে আমি সিঁটিয়ে যাই।

ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হয়, আমরা দু’জনেই তাকিয়ে দেখি আমাদের ছেলের পা সিঁড়ির মাথায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

সে রাতে আমার বর যখন ঘুমোতে যায় ওর সারা শরীর যেন রাগে টগবগ করে ফুটছে, স্বপ্ন দেখতে শুরু না করা অব্দি সে রাগ নামে না।

সেই নেমে যাওয়াটা আমি বোধ করতে পারি, আর শুধুমাত্র তখনই আমি নিজে ঘুমিয়ে পড়তে পারি।

পরের দিন, আমাদের ছেলে আমার গলায় হাত দেয় আর আমার ফিতেটার কথা জিজ্ঞেস করে। টানতে চেষ্টা করে ওটা। আমার কষ্ট হবে, কিন্তু তাও ওকে এটা আমায় বারণ করতে হয়। ও যখন ধরতে যায়, সঙ্গে সঙ্গে আমি পয়সায় ভর্তি একটা ক্যান নাড়িয়ে দিই। বেসুরো ঝনঝন বেজে ওঠে, ও চমকে সরে যায়, কেঁদে ওঠে। আমাদের মধ্যে কী একটা যেন হারিয়ে যায়, আর কোনও দিন সেটা আমি খুঁজে বার করে পারি না।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, একটা সোডার ক্যানে প্রচুর পয়সা পুরে তৈরি রাখুন। এই মুহূর্তটায় পৌঁছে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটির একদম মুখের কাছে সজোরে সেটা নাড়িয়ে দিন। লক্ষ্য করুন, তার মুখে ফুটে ওঠা চমকিত ভয়, তারপর বিশ্বাসভঙ্গের আঘাত। লক্ষ্য করুন, এর পর থেকে সারা জীবন সে আর আপনার দিকে ঠিক আর আগের মত করে তাকাবে না।)

*

মহিলাদের জন্য আর্ট ক্লাসটিতে গিয়ে ভর্তি হই আমি। বর অফিসে আর ছেলে স্কুলে চলে গেলে পর, গাড়ি চালিয়ে আমি ছড়ানো সবুজ ক্যাম্পাসটার ভিতরে সেই বেঁটেখাটো ধূসর বাড়িতে যাই যেখানে আমার আর্ট ক্লাসের ঠিকানা।

শালীনতা বজায় রাখার তাগিদেই হয়তো, পুরুষ ন্যুড মডেলদের আমাদের চোখের সামনে আনা হয় না, তবে ক্লাসটার একটা নিজস্ব ছন্দ আছে – এক অচেনা নারীর নগ্ন অবয়বে দেখার অনেক কিছু থাকে, কাঠকয়লা আর রঙ গুলতে গুলতে ভাবার থাকে অনেক কিছু। একাধিক মেয়েকে আমি দেখি কিছুক্ষণ পর পর চেয়ারে এগিয়ে পিছিয়ে বসে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টায়।

এক মহিলা বার বার ফিরে ফিরে আসে। তার ফিতেটি লাল, তন্বী গোড়ালিটি ঘিরে প্যাঁচানো। তার গায়ের রঙ অলিভের মত, নাভিমূল থেকে যোনিমূল পর্যন্ত নেমে এসেছে ঘন কালো চুলের রেখা। আমি জানি ওকে কামনা করা আমার উচিত নয়, সে মেয়ে বলে বা অপরিচিত বলে নয়, আসলে তার কাজই তো হল নগ্ন হওয়া, আর তার এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছি বলে লজ্জা লাগে। কিন্তু আমার পেন্সিল যখন তার দেহের বিভঙ্গকে রূপ দেয়, আমার মনের গহীন কোণে আমার আঙুল তার সাথে সাথে চলে। এমনটা যে সত্যি হতে পারে তার কোনও নিশ্চয়তাই আমার কাছে নেই, কিন্তু সম্ভাবনাগুলো আমায় উত্তেজনায় প্রায় পাগল করে দেয়।

এক বিকেলে ক্লাসের পর করিডরের একটা মোড় ঘুরে দেখি সে, সেই মহিলা। নগ্ন নয়, গায়ে রেনকোট জড়ানো একটা। তার দৃষ্টি আমায় মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়, মণিদুটো ঘিরে সোনালি বলয় এক একটা, চোখদু’টো যেন বা জোড়া সূর্যগ্রহণ। আমায় সম্ভাষণ জানায় সে, আমিও জানাই।

কাছের একটা রেস্তোঁরার একটা বুথে গিয়ে বসি আমরা, ফর্মিকা টেবিলের তলায় আমাদের হাঁটু মাঝেমাঝে একে অপরকে ছুঁয়ে যায়। সে একটা ব্ল্যাক কফি নেয়। আমি জিজ্ঞেস করি, তার ছেলেমেয়ে আছে কিনা। আছে, সে বলে, এক মেয়ে, এগারো বছরের একটি ছোট্ট সুন্দর মেয়ে।

– এগারো বড় ভয়ঙ্কর বয়স, সে বলে। এগারো বছরের আগে আমার কোনও স্মৃতি নেই, ঐ বয়সটা আচমকা প্রতিভাত হয়, তার সমস্ত রঙ আর সমস্ত বিভীষিকা নিয়ে। কী সংখ্যা একটা, সে বলে, কী অসাধারণ সময়। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ যেন অন্য কোথাও চলে যায়, যেন বা কোনও দীঘির মাঝখানে ডুব দিল সে।

মেয়ে মানুষ করার বিশেষ বিশেষ শঙ্কাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি না। সত্যি বলতে, জিজ্ঞেস করতে আমার ভয় করে। আমি এটাও জিজ্ঞেস করি না যে সে বিবাহিত কিনা, আর সে নিজে থেকেও কিছু বলে না, তবে তার আঙুলে আংটি নেই। আমরা কথা বলি আমার ছেলেকে নিয়ে, ক্লাসটা নিয়ে। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে কোন বাধ্যবাধকতা তাকে পাঠিয়েছে আমাদের সামনে নগ্ন হওয়ার কাজে, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করি না, কারণ উত্তরটা হয়তো এত ভয়াবহ যে কোনও দিন ভোলা যায় না, বয়ঃসন্ধির মতোই।

আমি বিমোহিত, একে আর অন্য কিছু বলা যায় না। তার মধ্যে একটা সহজ কিছু আছে, কিন্তু সেই অর্থে সহজ নয় যেমনটা আমি ছিলাম, আছি। সে যেন ময়দার তাল, মাখার সময় হাতের চাপে তার আনতি ঢেকে রাখে তার বলিষ্ঠতা, তার সম্ভাবনা। তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে যখন আবার চোখ ফেরাই, তার উপস্থিতি যেন আরও অনেকটা করে বড় দেখায়।

আমরা আবার এক দিন এরকম আড্ডা দিতে পারি তো, আমি বলি তাকে। বিকেলটা খুব ভালো কাটল।

সে মাথা নাড়ে। আমি তার কফির দাম দিই।

বরকে আমি তার ব্যাপারে বলতে চাই না, কিন্তু সে আমার ভিতরে চাপা কাম বোধ করতে পারে। এক রাতে সে জিজ্ঞেস করে, আমার ভিতরে ভিতরে চলছেটা কী, আর আমি তার কাছে সব স্বীকার করে ফেলি। এমনকী মহিলার ফিতেটারও বর্ণনা দিই, আর আরেক দফা লজ্জা আমায় ধাক্কা দিয়ে যায়।

ব্যাপারটায় ও এতই আনন্দ পায় যে একটা লম্বা ও বিশদ ফ্যান্টাসি ফিসফিস করে বলতে বলতে প্যান্ট খুলে ফেলে আমায় প্রবেশ করে। আমার মনে হয় মহিলার সঙ্গে কোনও রকম একটা বিশ্বাসভঙ্গ করে ফেলেছি, আর কোনও দিন ঐ ক্লাসে ফেরত যাই না।

(গল্পটা যদি জোরে পড়ে শোনান, একজন শ্রোতাকে তার কোনও একটা গোপন কথা প্রকাশ করতে বাধ্য করুন, তারপর রাস্তার সবচেয়ে কাছের দিকের জানলাটা খুলে যত জোরে পারেন চেঁচিয়ে কথাটা বলে দিন।)

*

আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হল এক বুড়ি আর তার বুড়ো বরকে নিয়ে – লোকটা যাকে বলে মহাপাষণ্ড, সে বুড়িকে তার মারমুখী মেজাজ আর চূড়ান্ত খামখেয়ালিপনা দিয়ে দাবিয়ে রাখত। স্বামীকে সে একটা অস্ত্রেই তুষ্ট রাখতে পেরেছিল, তার অতুলনীয় রান্নার হাত, যার কাছে স্বামী পুরোপুরি বশ। এক দিন বুড়ো তার রাঁধার জন্য মোটাসোটা একটা কলিজা এনে রেখেছে, আর বুড়ি রেঁধেওছে তরিবৎ করে, নানান মশলা দিয়ে। কিন্তু তার নিজের শিল্পকর্মের সুগন্ধে সে নিজেই মোহিত হয়ে পড়ে, দু’একটা গুঁড়ো খুঁটে খাওয়া থেকে শুরু করে দু’এক কামড় বসানো হয়ে যায়, আর পলক না ফেলতেই কলিজা সাবাড়। আরেকটা কিনে আনবে এত টাকা বুড়ির ছিল না, আর ফিরে এসে খাবার না পেলে বুড়ো কী করবে তা ভেবেই সে ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছিল। কাজেই সে লুকিয়ে বাড়ির পাশের গির্জাটায় গেল, যেখানে খুব সম্প্রতিই এক মহিলার অন্তিম সৎকারের জন্য এনে রাখা হয়েছে। ঢাকা দেওয়া মৃতদেহটার কাছে গিয়ে সেটাকে একটা রান্নাঘরের কাঁচি দিয়ে কাটল, তারপর শব থেকে কলিজাটা চুরি করে নিল।

সে রাতে বুড়ির বর তৃপ্তি করে রুমাল দিয়ে মুখ মুছল, তারপর ঘোষণা করল এটা তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম খাওয়া। শুতে যাওয়ার পর, বুড়ি শুনতে পেল সদর দরজাটা খুলে গেল, আর ঘরে ঘরে ধাক্কা খেয়ে একটা ক্ষীণ কন্ঠস্বর ভেসে এল। আমার কলিজা কার কাছে? আমার কলিজা কাআআআআআর কাছে?

বুড়ি শুনতে পেল গলাটা ক্রমশই তার শোয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। দরজাটা যখন খুলল তখন চারদিক নিস্তব্ধ। মৃতা মহিলা তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল।

বুড়ি তার বরের গা থেকে কম্বলটা সরিয়ে দিল।

– ওর কাছে আছে! বিজয়ীর উল্লাসে ঘোষণা করল বুড়ি।

তারপরেই সে দেখতে পেল মৃতা মহিলার মুখটা, আর চিনতে পারল তার নিজের ঠোঁট, তার নিজের চোখজোড়া। নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ল, কী ভাবে সে নিজের পেট ছুরি দিয়ে কেটেছিল। রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে তোষকের একদম গভীরে পৌঁছচ্ছে যখন, তার পাশে তার স্বামী অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

গল্পটার এই সংস্করণটার সঙ্গে হয়তো আপনারা পরিচিত নন। তবে আমি কথা দিচ্ছি, এইটাই আপনাদের জানা দরকার।

*

হ্যালোউইন নিয়ে অদ্ভূত ভাবে আমার বর বেশ উত্তেজিত। ছেলে আমাদের এখন এতটা বড়ো হয়েছে যে সে হেঁটেচলে ট্রিটের ঝুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবে। আমার বরের পুরোনো একটা টুইড কোট নিয়ে সেটা দিয়ে ছেলের জন্য একটা বানিয়ে দিই, একটা খুদে প্রফেসর কি ঐরকমই কোনও এক রাশভারী বিদ্বজন সাজাবো বলে। আমার বর ওকে একটা পাইপও দিয়েছে চেবানোর জন্য। ছেলে সেটা দাঁতের পাটির ফাঁকে নিয়ে এমন করে খেলে, দেখে কী রকম অস্বস্তিকর ভাবে বড়দের মত লাগে।

– মাম্মা, আমার ছেলে বলে, তাহলে তুমি কী?

আমি তো আর কস্টিউম পরে নেই, আমি বলি আমি তোমার মা।

ওর খুদে মুখ থেকে পাইপটা মাটিতে পড়ে যায়, চিৎকার করে ওঠে ও। আমার বর তড়িৎগতিতে এসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে নীচু গলায় ওর সঙ্গে কথা বলে, ফোঁপানির মাঝে মাঝে ওর নাম ধরে ডাকে বারবার।

তার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করার আগে অব্দি আমি আমার ভুলটা ধরতে পারিনি। ও এতটাও বড় হয়নি যে সেই দুষ্টু মেয়েগুলোর গল্পটা জানবে, যারা একটা খেলনা ড্রাম চেয়েছিল, আর নিজেদের মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে গেছিল যত দিন না তিনি চলে যান আর তাদের এক নতুন মা আসে – কাচের চোখ আর সপাৎ সপাৎ ঘুরতে থাকা কাঠের ল্যাজওয়ালা। কিন্তু আমি নিজের অজান্তেই তাকে অন্য একটা গল্প বলে দিয়েছি – সেই ছোট্ট ছেলেটার গল্প যে এক হ্যালোউইনে জানতে পারে যে তার মা আসলে তার নিজের মা নয়, শুধু সেই দিনটার জন্যই সে মা যে দিন সবাই মুখোশ পরে থাকে। অনুশোচনা আমার গলা বেয়ে গরম ঢেউয়ের মত উঠে আসে। ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে চেষ্টা করি, কিন্তু ও এখন শুধুই রাস্তায় বেরোতে চায়, যেখানে সূর্য পাটে নেমেছে আর কুয়াশা মাখা একটা চোরা ঠান্ডা ছায়ায় ছায়ায় ঘনিয়ে আসছে।

সে বাড়ি ফেরে হাসতে হাসতে, গালে একটা লজেন্স যার দৌলতে গোটা মুখময় প্লাম রঙের হয়ে গেছে। আমি বরের উপর রেগে যাই। বাড়ি ফেরার আগেই ঝুলি থেকে খেতে না দিলেই পারত। ঐ গল্পগুলো কি ও শোনেনি? চকোলেটের ভিতর পিন ঢোকানো থাকে, আপেলের ভিতর লুকিয়ে থাকে ব্লেডের টুকরো? আমি ছেলের মুখ ভালো করে দেখি, টাকরায় কোনও ধারালো ধাতব কিছু লেগে নেই। হাসতে হাসতে বাড়ির চক্কর কাটে সে, অত টফি-লজেন্স আর উত্তেজনার চোটে এখনও অভীভূত, বিহ্বল। আমার পা জড়িয়ে ধরে, আগের ঘটনাটা আর মাথাতেই নেই। যে কোনও বাড়িতে দেওয়া যে কোনও মিঠাইয়ের চেয়েও বেশি মধুর লাগে তার এই ক্ষমা। আমার কোলে চড়ে বসে যখন, ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত আমি গান শুনিয়ে যাই।

*

আমাদের ছেলে আটে পড়ল, দশে পড়ল। প্রথমে, তাকে রূপকথা শোনাই – সবচেয়ে পুরাতন গল্পগুলো, সব যন্ত্রণা, মৃত্যু আর গাজোয়ারি বিয়ের উল্লেখগুলো মৃত আগাছার মত সযত্নে ছেঁটে ফেলে দিয়ে। মৎস্যকন্যাদের পা গজায়, আর মনে হয় যেন উৎসব শুরু হবে। দুষ্টু শুয়োর ছানারা নেমন্তন্ন বাড়ি থেকে ছুট্টে পালায়, অক্ষত, রান্না না হওয়া অবস্থায়। শয়তান ডাইনিরা প্রাসাদ ছেড়ে ছোট্ট কুঁড়েঘরে চলে যায় আর বনের পশুপাখির ছবি এঁকে জীবন কাটিয়ে দেয়।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য প্রশ্ন করতে শুরু করে। শুয়োরটাকে ওরা খেল না কেন, ওদের তো খিদে পেয়েছিল, আর সেও তো শয়তানি কম করেনি? অত ভয়ানক সব কাণ্ড ঘটানোর পরেও ডাইনিকে কেন ছেড়ে দেওয়া হল? আর একবার কাঁচিতে হাত কেটে ফেলার পর থেকে তো, পা ফেটে পাখনা গজানোর অনুভূতিটা যে নরকযন্ত্রণার কিছু কম হতে পারে সেটা মানতেই আর সে রাজি নয়।

– খুব নাগবে তো, সে বলে, কারণ ওর এখনও ‘ল’ বলতে সমস্যা হয়।

আমি মেনে নিই। সত্যিই লাগবে। তাই এর পর থেকে আমি ওকে বাস্তবের কাছাকাছি গল্প বলতে শুরু করি: রেললাইনের উপর একটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের গল্প, যারা এক অচেনা উদ্দেশ্যে ছুটে চলা ভুতুড়ে ট্রেনের ডাকে পা বাড়িয়েছিল; একটা কালো কুকুর, যে কারও মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে তার বাড়ির দরজায় এসে উপস্থিত হয়; তিনটে ব্যাঙ, যারা জলা জায়গায় পথিককে ধরে ভাগ্য বলে দেয় নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে।

স্কুলে ‘ছোট্ট অভিযাত্রী’ নাটক হচ্ছে, আর ও মুখ্য ভূমিকায়, খুদে অভিযাত্রী সেজেছে। আমি বাচ্চাদের কস্টিউম বানানোর জন্য মায়েদের একটা কমিটিতে যোগ দিই। এক ঘর মহিলার মধ্যে আমিই সর্দার দর্জি, ফুল-শিশুদের জন্য ছোট ছোট সিল্কের পাপড়ি জোড়া দিচ্ছি আমরা, আর জলদস্যুদের জন্য খুদে খুদে পাতলুন সেলাই করছি। এক মায়ের আঙুলে একটা হালকা হলুদ ফিতে আছে, আর বারে বারে সেটা তার সুতোয় জড়িয়ে যাচ্ছে। মহিলা প্রায়ই রাগে গালাগালি দেয়, কেঁদেও ফেলে। একদিন তো জড়িয়ে যাওয়া সুতোগুলোকে ছাড়াতে আমায় সেলাইয়ের কাঁচি লাগাতে হয়। আমি খুব যত্ন করে ছাড়াতে চেষ্টা করি। ফুলের পাপড়ি থেকে তাকে মুক্ত করছি যখন, সে ঘাড় নাড়ে।

– মহা ঝামেলা এটা, না? সে বলে।

আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলি। জানলার বাইরে বাচ্চারা খেলা করে – স্লিপ আর দোলনা থেকে একে অপরকে ঠেলে ফেলে দেয়, ড্যান্ডেলিয়ন ফুলের মাথা ছিঁড়ে নেয়। নাটক জমে যায়। প্রথম শোয়ের দিন, আমাদের ছেলে তার একক সংলাপে ফাটিয়ে দেয়। একেবারে নিখুঁত স্বরক্ষেপ আর ছন্দজ্ঞান। এত ভালো কেউ কোনও দিন করেনি।

আমার ছেলের বয়স বারো। সে আমায় ফিতেটার কথা জিজ্ঞেস করে, একেবারে সরাসরি। আমি তাকে বলি, আমরা সবাই আলাদা আলাদা, আর কখনও কখনও প্রশ্ন করা উচিত নয়। আমি তাকে অভয় দিই, বড় হলে সে বুঝবে। যে সব গল্পে ফিতে নেই সেইসব দিয়ে তাকে ভুলিয়ে রাখি: যে সব দেবদূতরা মানুষ হতে চেয়েছিল, যে ভূতেরা বুঝতে পারেনি যে তারা মৃত, যে বাচ্চারা ছাই হয়ে গেছিল একদিন। ওর গা থেকে শিশু গন্ধটা চলে যায় – দুধেলা মিষ্টি গন্ধ চলে গিয়ে একটা তীক্ষ্ণ, পোড়া কিছুর গন্ধ চলে আসে, যেন স্টোভের উপর চুল জ্বলছে একটা।

আমাদের ছেলে তেরোয়, চোদ্দোয় পড়ল। স্কুলে যাওয়ার পথে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যায় প্রতিদিন, অন্যদের চেয়ে কিছু ধীরে হাঁটা প্রতিবেশী ছেলেটির জন্য। খুব সূক্ষ্ণভাবে সহমর্মী হতে পারে আমার ছেলে। হিংসাত্মক প্রবণতার কণামাত্র নেই, যেমনটা অনেকেরই থাকে।

– দুনিয়ায় গুন্ডামি করার লোক যথেষ্ট আছে, আমি ওকে বারবার বলেছি।

এই বছরেই ও আমার কাছ থেকে গল্প শুনতে চাওয়া বন্ধ করে দেয়।

আমাদের ছেলের বয়স এখন পনেরো, ষোলো, সতেরো। হাই স্কুলের এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার দেখাশোনা শুরু হয়, তার হাসিটি ভারি উজ্জ্বল, তার উপস্থিতি উষ্ণ। মেয়েটির সঙ্গে দেখা করে আমি খুশি, কিন্তু ওদের ফিরে আসার জন্য জেগে বসে থাকার বায়না ধরি না, নিজের যৌবন মনে পড়ে।

যে দিন আমায় জানায় যে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়েছে, আমার আনন্দ বাঁধ মানে না। হাসতে হাসতে গাইতে গাইতে গোটা বাড়ি ছুটোছুটি করি আমরা। বর বাড়ি ফিরে আমাদের উদ্‌যাপনে যোগ দেয়, আর তার কাছের একটা সামুদ্রিক রান্নার রেস্তোঁরায় খেতে যাই আমরা। হ্যালিবাটে কামড় বসিয়ে তার বাবা তাকে বলে, তুমি আমাদের গর্ব। আমাদের ছেলে হাসে, বলে যে সে তার পছন্দের মেয়েটিকে বিয়েও করতে চায়। আমরা পরস্পরের হাত চেপে ধরি, আরও আনন্দিত হয়ে। কী ভালো ছেলে হয়েছে আমাদের। কী সুন্দর একটা জীবন তার সামনে।

পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী নারীও এত আনন্দ কোনও দিন পায়নি।

*

একটা ক্লাসিক গল্প এখনও আপনাদের বলা হয়নি, সত্যিকারের ক্লাসিক যাকে বলে।

এক প্রেমিক ও প্রেমিকা একবার গাড়ি লাগাতে গেছিল। কারও কারও মতে এই বাগ্‌ধারাটার মানে হল গাড়িতে বসে চুমু খাওয়া, কিন্তু আমি আসল গল্পটা জানি। আমি ছিলাম সেখানে। ওরা একটা দীঘির ধারে গাড়ি লাগিয়েছিল। পৃথিবীটা আর যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বংস হতে বসেছে এমন মরিয়া আশ্লেষে পিছনের সিটে আছাড়িপিছাড়ি করছিল তারা। হয়তো সত্যিই ধ্বংস হতে বসেছিল। মেয়েটি নিজের সবটুকু ছেলেটির জন্য মেলে ধরেছিল, আর ছেলেটিও গ্রহণ করেছিল তা, আর সবকিছু মিটলে পরে তারা রেডিওটা চালিয়ে দিয়েছিল।

রেডিওর যান্ত্রিক গলা ঘোষণা করছিল যে এক পাগল, হাতের জায়গায় হুক বসানো খুনি কিছুক্ষণ আগেই স্থানীয় একটা পাগলাগারদ থেকে পালিয়েছে। প্রেমিকটি মুচকি হেসে চ্যানেল পালটে একটা গানের চ্যানেল দিল। গানটা শেষ হলে প্রেমিকাটি শুনতে পেল একটা ক্ষীণ ঘষার শব্দ আসছে, যেন কাচের উপর পেপারক্লিপ টানছে কেউ। সে তার প্রেমিকের দিকে একবার তাকালো, তারপর নিজের নগ্ন কাঁধের উপর কার্ডিগানটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে, এক হাত দিয়ে বুক ঢেকে নিল।

– আমাদের চলে যাওয়া উচিত, মেয়েটি বলল।

– না সোনা, আমাদের বরং আরেকবার যাওয়া উচিত, তার প্রেমিকটি বলল।

– খুনিটা যদি এদিকে আসে? মেয়েটি জিজ্ঞেস করল। পাগলাগারদটা খুবই কাছে।

– কিচ্ছু হবে না সোনা, তার প্রেমিক বলল। তুমি কি আমায় একটুও ভরসা কর না?

মেয়েটি নিরুপায় হয়ে ঘাড় নাড়ল।

– তাহলে তো… ছেলেটি বলে উঠল। কথা শেষ না করার তার এই অভ্যাসটা মেয়েটির অতিপরিচিত হয়ে উঠবে আর কিছুদিনেই। ছেলেটি প্রেমিকার বুকের উপর আড়াল করে রাখা হাতটি নিয়ে নিজের উপর রাখল। অবশেষে দীঘির কালো পাড় থেকে চোখ সরালো মেয়েটি।

বাইরে, চকচকে স্টিলের হুকে পিছলে গেল চাঁদের আলো। খুনিটা একগাল হেসে তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল।

আমি দুঃখিত। গল্পের বাকিটা আমি ভুলে গেছি।

*

ছেলে চলে যাওয়ার পর বাড়িটা একেবারে নিঃঝুম হয়ে গেছে। আমি তার ভিতরে হাঁটি, সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। আমি সুখী, কিন্তু আমার ভিতরে কী একটা যেন অচেনা অদ্ভূত পরিসর ধীরে ধীরে দখল নিয়ে নিয়েছে।

সে রাতে, আমার বর শুধোয়, খালি ঘরগুলোর নতুন নামকরণ হোক, নাকি? ছেলে জন্মানোর পর থেকে এত প্রবল ভাবে সঙ্গম আমরা আর করিনি। রান্নাঘরের টেবিলের উপর উপুড় হয়ে থাকতে থাকতে আমার ভিতরে অনেক পুরোনো একটা আগুন জ্বলে ওঠে যেন, আমার মনে পড়ে যায় এককালে কতটা তীব্র ছিল আমাদের কাম, কীভাবে সমস্ত আসবাবের উপর আমাদের লিপ্সার চিহ্ন আঁকা হয়ে থাকত এককালে। সতেরো বছর বয়সে ঐ পার্টিতে যে কারওর সঙ্গে দেখা হতে পারত আমার – অতিরিক্ত গোঁড়া, বা হয়তো উগ্র স্বভাবের কোনও ছেলে। অতিধার্মিক ছেলে হলে হয়তো আমায় দূর কোনও দেশে যেতে বাধ্য করত সে, সেখানকার বাসিন্দাদের ধর্মান্তকরণের পুণ্য উদ্দেশ্যে। অসংখ্য অতৃপ্তি, অসংখ্য দুঃখ আসতে পারত আমার জীবনে। কিন্তু, ওকে মেঝের উপর ফেলে ওর উপর চড়ে দুলতে দুলতে গলা দিয়ে শীৎকার বেরিয়ে আসতে আসতে আমি বুঝতে পারি, আমি ঠিক মানুষকেই বেছেছি।

বিছানায় নগ্ন শরীর এলিয়ে দিয়ে রতিক্লান্ত আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। জেগে উঠি যখন, দেখি আমার বর ঘাড়ের পিছনটায় চুমু খাচ্ছে, তার জিভ ধাক্কা দিচ্ছে আমার ফিতেটার গায়ে। আমার শরীর তীব্র ভাবে বিদ্রোহ করে ওঠে, তার আনাচে কানাচে সুখস্মৃতি এখনও মধুর, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতায় কঠিন হয়ে উঠছে সে। আমি ওর নাম ধরে ডাকি, ও জবাব দেয় না। আমি আবার ডাকি, এবার ও আমায় নিজের সঙ্গে চেপে ধরে যা করছিল করে যেতে থাকে। আমি কনুই দিয়ে ওর কোমরে এক ধাক্কা মারি, চমকে উঠে ওর বাঁধন আলগা হয়ে যায়, আমি উঠে বসে ওর দিকে ফিরি। ওর মুখে বিভ্রান্তি আর আঘাত মাখা, ঠিক আমার ছেলের মুখের মত যে দিন ওর সামনে ঐ পয়সার ক্যানটা নাড়িয়ে দিয়েছিলাম আমি।

আমার সংকল্প ভেঙে পড়ে। ফিতেটা স্পর্শ করি। আমার বরের মুখের দিকে তাকাই, ওর কামনার শুরু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত ঐ মুখে লেখা আছে। ও মানুষটা খারাপ নয়, আর সেটাই আমার কষ্টের মূল, বুঝতে পারি হঠাৎ। ও মানুষটা একেবারেই খারাপ নয়, আর তাও –

– তুমি কি ফিতেটা খুলতে চাও? আমি জিজ্ঞেস করি ওকে। আজ এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে এটাই তোমার আমার কাছে চাহিদা?

ওর মুখে প্রথমে খুশি ঝলক দিয়ে যায়, আর তারপর লোভ, আর আমার নগ্ন বুক বেয়ে ওর হাত উঠে যায় ফিতের দিকে।

– হ্যাঁ, ও বলে। হ্যাঁ।

– তাহলে, আমি বলি, যা তোমার ইচ্ছে হয় কর।

কাঁপা কাঁপা আঙুলে ফিতের একটা দিক ধরে টানে ও। ফুলটা খুলতে থাকে, ধীরে, ডগাগুলো দীর্ঘ অভ্যাসে পাকিয়ে পাকিয়ে নামে। আমার বরের গলা দিয়ে গোঙানি উঠে আসে একটা, কিন্তু আমার মনে হয় না ও এখনও বুঝতে পারছে। শেষ ফাঁসটার ভিতর আঙুল জড়িয়ে টান মারে ও। ফিতেটা খুলে আসে। পালকের মত ভেসে নেমে এসে আমার পায়ের কাছে গুটিয়ে পড়ে থাকে, বা তেমনটাই আমি কল্পনা করি, কারণ মাথা ঝুঁকিয়ে তার গতিপথ অনুসরণ করার ক্ষমতা আমার নেই।

আমার বরের ভুরু কুঁচকে যায়, আর তারপর তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যেতে থাকে – বেদনা, বা হয়তো অপূরণীয় ক্ষতির উপলব্ধি। আমার হাতদু’টো শূন্যে উঠে যায় – শরীরের অনৈচ্ছিক চলন, হয়তো বা ভারসাম্য বজায় রাখার একটা শেষ চেষ্টা বা ঐ রকমই কোনও অনর্থক কারণে – আর তাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় ওর মুখ।

– আমি তোমায় ভালোবাসি, ওকে আশ্বস্ত করি আমি, তুমি যতটা ভাবতে পারো তার চেয়ে অনেক বেশি।

– না, ও বলে, কিন্তু আমি জানি না ও কিসের কথা বলছে।

এই গল্পটা জোরে পড়ে শোনালে, আপনি হয়তো এতক্ষণে ভাবতে শুরু করেছেন যে ফিতের আড়ালে থাকা জায়গাটা কী রকম ছিল, রক্তমাংস আর খোলা ঘা, নাকি পুতুলের হাত-পায়ের জোড়ের মত মসৃণ, শীলিত। এটা আমি আপনাদের জানাতে পারব না, কারণ আমি জানি না। এই প্রশ্ন, এবং আরও সব প্রশ্ন, এবং তাদের উত্তর দিতে না পারার জন্য আমি দুঃখিত।

আমার পা টলমলিয়ে ওঠে, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মাধ্যাকর্ষণ আমাকে গ্রাস করে। আমার বরের মুখ পিছনে সরে যায়, আর তারপর আমি ঘরের ছাদটা দেখতে পাই, আর তারপর আমার পিছনের দেওয়াল। আমার কাটা মাথা ঘাড় থেকে লাফিয়ে নেমে খাট থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়, সারা জীবন ধরে যতটা একা ছিলাম, ঠিক ততটাই একাকীত্ব গ্রাস করে আমাকে।

সঙ্গের ছবি জর্জিয়া ও’কীফ-এর Music Pink and Blue II, ১৯১৮ সালের শিল্পকর্ম। নেওয়া হয়েছে এই ওয়েব ঠিকানা থেকে।

1 thought on “অনুবাদ: দ্য হাজব্যান্ড স্টিচ, কারমেন মারিয়া মাচাদো”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s